পঞ্চাশের মন্বন্তর থেকে আজকের বিশ্বায়ন এবং খাদ্য নিয়ে ছিনিমিনি খেলার রাজনীতি।

0 0
1777223745866

বাংলাদেশের গ্রাম অঞ্চলের দিকে যখন আমরা ফসলের বিস্তীর্ণ মাঠ দেখি তখন মনে হয় আমাদের খাদ্যের অভাব হওয়ার কথা নয়। কিন্তু বিশ্বরাজনীতির চাবিকাঠি যারা নাড়ে তাদের কাছে আমাদের এই মাঠের ফসলের কোনো মূল্য নেই। ১৯৪৩ সালের পঞ্চাশের মন্বন্তর নিয়ে আমরা যখন ভাবি তখন আমাদের চোখের সামনে ভেসে ওঠে হাড্ডিসার কিছু মানুষের ছবি যারা খাবারের অভাবে রাস্তায় ধুঁকে ধুঁকে মরেছে। কিন্তু আবেগের চশমাটা খুলে যদি আমরা একদম খাঁটি যুক্তির জায়গা থেকে হিসাব করি তাহলে দেখব সেটা কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগ বা খরা ছিল না। ওটা ছিল গ্লোবাল সাপ্লাই চেইন বা বিশ্ব সরবরাহ ব্যবস্থাকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করার একটা নির্মম উদাহরণ। ঠিক যেমন আজ রাশিয়া আর ইউক্রেনের যুদ্ধের কারণে বা মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনার ফলে সারা বিশ্বে গমের দাম বাড়ে তেলের দাম বাড়ে আর তার ধাক্কা এসে লাগে আমাদের সাধারণ মানুষের পকেটে। আশি বছর আগে ব্রিটিশরাও ঠিক এই কাজটাই করেছিল।

​দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ডামাডোলে জাপান যখন বার্মা দখল করে নিল ব্রিটিশদের মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ল। তারা ভাবল এবার হয়তো বাংলাতেও জাপানিরা ঢুকে পড়বে। সেই ভয় থেকে তারা যে চাল বা খাদ্যশস্য আমাদের উদ্বৃত্ত ছিল তা সরিয়ে ফেলল এবং নৌকাগুলো ধ্বংস করে দিল। অর্থাৎ তারা লোকাল সাপ্লাই চেইন পুরোপুরি গলা টিপে ধরল। বার্মা থেকে যে চাল আসত সেটা বন্ধ হয়ে গেল আর বাংলার চাল চলে গেল ব্রিটিশ সৈন্যদের পেটে। অমর্ত্য সেন খুব সুন্দর করে দেখিয়েছিলেন যে বাজারে চাল ছিল কিন্তু সাধারণ মানুষের কেনার ক্ষমতা ছিল না। কারণ ক্ষমতাশালীরা তখন মুদ্রাস্ফীতি আর মজুতদারির একটা এমন সিস্টেম দাঁড় করিয়েছিল যেখানে গরিব মানুষের বেঁচে থাকার কোনো অধিকার ছিল না। আজকে যখন আমরা দেখি পরাশক্তিগুলো স্যাংশন দিয়ে বা শিপিং রুট আটকে দিয়ে এক দেশ আরেক দেশকে ভাতে মারার চেষ্টা করছে তখন ১৯৪৩ সালের ওই নোংরা ভূরাজনীতির কথাই বারবার মনে পড়ে।

​আজকের দুনিয়ায় সাপ্লাই চেইন কোনো সাধারণ ব্যবসায়িক বিষয় নয় বরং এটি একটি ভয়ংকর ভূরাজনৈতিক অস্ত্র। আমরা যখন বিশ্বায়নের বড় বড় কথা বলি তখন ভুলে যাই যে এই বিশ্বায়ন আসলে কয়েকটা ক্ষমতাশালী দেশের হাতের মুঠোয়। তারা যখন চাইবে গমের সাপ্লাই বন্ধ করে দেবে তারা যখন চাইবে সারের দাম বাড়িয়ে দেবে। পঞ্চাশের মন্বন্তরের সময় উইনস্টন চার্চিল যেমন আমাদের মানুষ বলেই মনে করতেন না আজকের দুনিয়ার মোড়লরাও গ্লোবাল সাউথ বা তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোকে এর চেয়ে খুব বেশি সম্মান করে না। তাদের জিওপলিটিক্যাল দাবার বোর্ডে আমরা কেবলই কিছু বোড়ে। কোনো বড় যুদ্ধ লাগলে বা মহামারি এলে সবার আগে আমাদের থালার খাবার গায়েব হয়ে যায়। আইসিপি ভিশনের জায়গা থেকে এই সত্যটা পাঠকের সামনে পরিষ্কার করা খুব জরুরি যে খাদ্য নিরাপত্তা এখন আর শুধু কৃষকের বিষয় নয় এটা রাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় প্রতিরক্ষা কৌশল।

​আমাদের বর্তমান নীতিগত চিন্তাধারায় একটা বড় দুর্বলতা হলো আমরা মনে করি রিজার্ভে টাকা থাকলে আন্তর্জাতিক বাজার থেকে যেকোনো সময় খাবার কিনে আনা যাবে। এই ভাবনাটা চরম আত্মঘাতী। যখন গ্লোবাল সাপ্লাই চেইন কলাপস করে তখন পকেটে টাকা থাকলেও জাহাজে করে চাল গম আসে না। এই দুর্বল জায়গাটা মেরামত করতে হলে আমাদের দুটো বিকল্প স্ট্র্যাটেজিক পথে হাঁটতে হবে।

​প্রথমত আমাদের লোকাল এগ্রিকালচারাল ইনোভেশন বা আঞ্চলিক কৃষি প্রযুক্তিতে বড় ধরনের বিনিয়োগ করতে হবে যাতে হাইব্রিড এবং বৈরী আবহাওয়া সহনশীল ফসল আমরা নিজেদের মাটিতেই ফলাতে পারি এবং বাইরের বীজের ওপর নির্ভরশীলতা শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনতে পারি।

​দ্বিতীয়ত গ্লোবাল সাপ্লাই চেইনের একক নির্ভরতা কমিয়ে রিজিওনাল ব্লক বা প্রতিবেশী দেশগুলোর সাথে শক্ত ভূরাজনৈতিক ও বিকল্প বাণিজ্য চুক্তি করতে হবে যাতে পশ্চিমা বিশ্বের কোনো পথ বন্ধ হলে অন্তত রিজিওনাল চ্যানেল দিয়ে জরুরি রসদ আনা যায়। আবেগে ভেসে না গিয়ে আমাদের এই শক্ত ভূরাজনৈতিক হিসাব কষতে হবে কারণ ইতিহাস আমাদের বারবার মনে করিয়ে দেয় যে আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে দুর্বলকে কেউ দয়া করে না।

What do you feel about this?

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Latest News