জিয়ার বাংলাদেশে তারেকের নতজানু নীতি, ইরান ইস্যুতে ঢাকার নীরবতায় ক্রিপ্টো জায়োনিস্টদের ছায়া।

বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির সাম্প্রতিক গতিপথ নিয়ে রাজনীতির মাঠে এখন তীব্র আলোচনা চলছে এবং এই বিতর্কের কেন্দ্রে রয়েছে ইরান ইস্যুতে বর্তমান সরকারের দৃশ্যমান নীরবতা। মোহাম্মদ সজলের সাম্প্রতিক একটি বিশ্লেষণ এই নীরবতার পেছনের কারণগুলোকে একেবারে খোলাসা করে দিয়েছে। সজলের মতে, বর্তমান সরকার সরাসরি ইন্দো হিজরেলি এবং মার্কিন বলয়ের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে, যা স্বাধীন বাংলাদেশের ইতিহাসে এক নজিরবিহীন ঘটনা।
আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে যারা সরাসরি পশ্চিমা ব্লকের রাজনীতি করে, তারাও অন্তত পেছনের দরজা দিয়ে যোগাযোগ বজায় রাখে এবং ইমাম খামেনীর শাহাদাতের মতো বড় ঘটনায় শোক জানায়। কিন্তু বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে ন্যূনতম একটি ফোনালাপও করা হয়নি। এই আপসকামী নীতিকে ক্রিপ্টো জায়োনিস্টদের দ্বারা প্রভাবিত বলে মনে করেন সজল এবং তিনি স্পষ্টভাবে একে সরকারের সম্ভাব্য পতনের একটা বড় কারণ হিসেবে দেখছেন।
আমাদের অতীতের দিকে তাকালে বর্তমানের এই মেরুদণ্ডহীনতা আরও বেশি চোখে লাগে। শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান একসময় এই দেশ থেকেই ইরাক ইরান যুদ্ধে মধ্যস্থতা করেছিলেন এবং ফিলিস্তিন ও লেবাননে প্রতিরোধ যোদ্ধা পাঠিয়েছিলেন। বেগম খালেদা জিয়া চরম অর্থনৈতিক সংকটের মাঝেও ডোনাল্ড রামসফেল্ডের প্রচণ্ড রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে ইরাক যুদ্ধে সৈন্য পাঠাতে সোজা না করে দিয়েছিলেন।
সেই সময়ের অভাবী আর দুর্ভিক্ষপীড়িত বাংলাদেশের যে মেরুদণ্ড ছিল, আজকের দিনে তা যেন পুরোপুরি উধাও। এমনকি গাজায় আগ্রাসনের বিরুদ্ধেও বর্তমান প্রধানমন্ত্রী দীর্ঘদিন নীরব ছিলেন এবং প্রবল অনলাইন ব্যাশিংয়ের মুখেই কেবল তিনি মুখ খুলতে বাধ্য হন। সজলের এই কথাগুলো আসলে মাঠের সাধারণ মানুষের বুকের ভেতরের ক্ষোভেরই প্রতিধ্বনি। জনগণ চায় সরকার যেন এই নতজানু আচরণ থেকে বেরিয়ে এসে স্বাধীন এবং মেরুদণ্ডসম্পন্ন পররাষ্ট্রনীতি গ্রহণ করে।
সজলের এই পর্যবেক্ষণগুলো একদম নিখাদ এবং আবেগের জায়গা থেকে পুরোপুরি খাঁটি। কিন্তু ভূ রাজনীতির এই নির্মম খেলায় শুধু ক্ষোভ আর আবেগ দিয়ে একটা রাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতি বদলানো যায় না। সরকারের এই নীরবতা যদি সত্যিই কোনো বিদেশি শক্তির চাপে হয়ে থাকে, তবে শুধু সমালোচনা না করে এই ফাঁদ থেকে বের হওয়ার জন্য আমাদের বাস্তবমুখী কিছু পথ খুঁজতে হবে।
এই পরিস্থিতিকে একটু প্রেসার টেস্ট করলে দেখা যায়, সরাসরি সংঘাতে না গিয়েও নিজেদের শক্ত অবস্থান জানানোর সুযোগ আমাদের আছে। এই দুর্বলতা কাটিয়ে ওঠার জন্য তিনটি বিকল্প কৌশলগত পথের দিকে আমাদের মনোযোগ দিতে হবে।
প্রথমত, একা বুক চিতিয়ে লড়াই না করে আঞ্চলিক জোটগুলোকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করতে হবে। বাংলাদেশ এককভাবে কোনো বিবৃতি দিয়ে পরাশক্তিগুলোর টার্গেট না হয়ে, ওআইসি বা ডি এইটের মতো প্ল্যাটফর্মগুলোর মাধ্যমে সম্মিলিত কূটনৈতিক প্রতিক্রিয়া জানাতে পারে। এর ফলে পশ্চিমা অবরোধের ঝুঁকিও এড়ানো যায়, আবার মুসলিম বিশ্বের সাথে নিজেদের শক্ত অবস্থানও পরিষ্কার করা যায়।
দ্বিতীয়ত, অর্থনীতির বিকল্প খুঁটি শক্ত করতে হবে। আমাদের পররাষ্ট্রনীতির এই নতজানু দশার সবচেয়ে বড় কারণ হলো পশ্চিমা বাজারের ওপর আমাদের মাত্রাতিরিক্ত নির্ভরতা। এই জিম্মিদশা থেকে মুক্তি পেতে হলে মধ্যপ্রাচ্য এবং এশিয়ার অন্যান্য বিকল্প বাজারগুলোতে আমাদের শক্ত অবস্থান তৈরি করতে হবে। নিজেদের পেটের জোর আর অর্থনৈতিক ভিত মজবুত না থাকলে আন্তর্জাতিক টেবিলে মাথা উঁচু করে কথা বলা যায় না।
তৃতীয়ত, স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতির এই দাবিকে একেবারে নিরেট রাজনৈতিক চাপে রূপান্তর করতে হবে। সজলের এই বিশ্লেষণ বা সাধারণ মানুষের ক্ষোভকে শুধু অনলাইনের পাতায় আটকে রাখলে চলবে না।
একেবারে তৃণমূল পর্যায় থেকে শুরু করে তরুণ প্রজন্মের এই আবেগকে একটা সুসংগঠিত ডেটা নির্ভর কাঠামোর ভেতর দিয়ে রাজনৈতিক শক্তিতে পরিণত করতে হবে। যখন দেশের ভেতরের জনমত একটা প্রবল শক্তির রূপ নেবে, তখন কোনো বিদেশি চাপই সরকারকে জনগণের ইচ্ছার বাইরে গিয়ে সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য করতে পারবে না।