দিল্লির দাপট উপেক্ষা করে বাঙ্গালার নিজস্ব রাজত্ব

0 0
1776629917862

সালতানাত-ই-বাঙ্গালা কেবল একটা বিশাল সাম্রাজ্য ছিল না, বরং এটা ছিল আমাদের এই মাটির এক অনন্য আত্মপরিচয় তৈরির সময়। দিল্লির শাসন থেকে মুক্ত হয়ে শামসুদ্দিন ইলিয়াস শাহ যখন শাহ-ই-বাঙ্গালাহ উপাধি নিলেন, তখন থেকেই এই জনপদে এক নতুন সংস্কৃতির ভিত তৈরি হয়। এই সময়েই বাংলা ভাষা প্রথমবারের মতো রাজকীয় পৃষ্ঠপোষকতা পেতে শুরু করে। আগে যেখানে সংস্কৃত বা ফারসি দাপট দেখাত, সেখানে সুলতানদের আগ্রহে কৃত্তিবাসী রামায়ণ বা মালাধর বসুর শ্রীকৃষ্ণবিজয় রচিত হতে থাকে। এই যে মাটির ভাষার প্রতি সুলতানদের টান, এটাই মূলত আজকের বাঙালি সত্তার আদি রূপ।

​স্থাপত্যের দিকে তাকালে দেখা যায় সুলতানরা বাইরের দেশ থেকে নকশা ধার না করে বরং এদেশের আবহাওয়ার সাথে মানানসই এক নিজস্ব ঢং তৈরি করেছিলেন। আদিনা মসজিদ বা ছোট সোনা মসজিদের পোড়ামাটির কাজ আর বাঁশের কুঁড়েঘরের আদলে তৈরি বক্রাকার ছাদ যাকে আমরা দোচালা বা চৌচালা বলি, তা সারা পৃথিবীর স্থাপত্যবিদদের অবাক করে। এই স্থাপত্যশৈলী পরবর্তীতে মোঘলদেরও প্রভাবিত করেছিল। গঙ্গা-ব্রহ্মপুত্রের পলিমাটিতে বেড়ে ওঠা এই জনপদের সংস্কৃতি তখন হয়ে উঠেছিল এক উদার মিলনমেলা। সুফি সাধকদের দরগাহ আর গ্রামবাংলার লোকজ উৎসব মিলেমিশে এক আধ্যাত্মিক আবহাওয়া তৈরি করেছিল যা এই অঞ্চলের মানুষকে পরমতসহিষ্ণু হতে শিখিয়েছিল।

​খাবার-দাবার বা পোশাকের ক্ষেত্রেও সেই আভিজাত্য ফুটে ওঠে। মসলিন কাপড়ের সুখ্যাতি তখন বিশ্বজুড়ে, আর সুলতানি দস্তরখানায় স্থানীয় মাছ-ভাতের সাথে যুক্ত হয়েছিল ইরানি বা মধ্য এশীয় রান্নার কিছু ছোঁয়া। তবে সেই জৌলুস কখনো সাধারণ মানুষের শিকড় থেকে বিচ্ছিন্ন ছিল না। বাঙ্গালা সুলতানরা জানতেন এই ভূখণ্ডের সমৃদ্ধি লুকিয়ে আছে এর নদী আর সাধারণ মানুষের মেহনতের মধ্যে। আজ আমরা যে বাংলা ভাষা নিয়ে গর্ব করি বা যে লৌকিক আচার পালন করি, তার রেশ আসলে সেই সুলতানি আমলেরই উত্তরাধিকার। ইতিহাস কেবল ক্ষমতার লড়াই নয়, সুলতানাত-ই-বাঙ্গালা আমাদের শিখিয়েছে কীভাবে নিজের ভাষাকে ভালোবাসতে হয় আর মাটির সাথে মিশে থেকে এক অপরাজেয় সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হয়।

What do you feel about this?

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Latest News