মোদি-পুতিন ‘যুগান্তকারী’ চুক্তি, ভারতের মাটিতে রুশ সেনা মোতায়েনের অনুমতি

0 0
1777096610755

ঢাকা, ২৫ এপ্রিল ২০২৬: ভারত ও রাশিয়ার মধ্যে স্বাক্ষরিত ‘রেসিপ্রোকাল এক্সচেঞ্জ অফ লজিস্টিকস সাপোর্ট’ (RELOS) চুক্তি কার্যকর হওয়ার পর দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনীতিতে নতুন মেরুকরণ শুরু হয়েছে।বিভিন্ন মিডিয়ায় খবরে বলা হয়েছে, মোদি সরকারের এই “যুগান্তকারী সিদ্ধান্তে” ভারতের মাটিতে বিদেশি সেনা মোতায়েনের অনুমতি দেওয়া হয়েছে।

চুক্তির মূল বিষয়:

১. ২০২৫ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি মস্কোয় RELOS চুক্তি সই হয়। রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট পুতিন ১৫ ডিসেম্বর ২০২৫ এটিকে ফেডারেল আইনে পরিণত করেন। ১২ জানুয়ারি ২০২৬ থেকে চুক্তি কার্যকর।

২. চুক্তি অনুযায়ী ভারত ও রাশিয়া একে অপরের সামরিক ঘাঁটি, বন্দর ও বিমানঘাঁটি ব্যবহার করতে পারবে।

৩. একসাথে সর্বোচ্চ ৩,০০০ সেনা, ৫টি যুদ্ধজাহাজ ও ১০টি যুদ্ধবিমান অংশীদার দেশের ভূখণ্ডে মোতায়েন রাখা যাবে। মেয়াদ ৫ বছর, দুই পক্ষের সম্মতিতে আরও ৫ বছর বাড়ানো যাবে।

৪. নৌযানের জন্য বন্দর সুবিধা, মেরামত, জ্বালানি-খাদ্য-পানি সরবরাহ এবং বিমানের জন্য এয়ার ট্রাফিক কন্ট্রোল, পার্কিং ও নিরাপত্তা সুবিধা দেওয়া হবে।

এটি প্রথমবারের মতো ভারত শান্তি ও যুদ্ধ উভয় সময়ে বিদেশি সেনাদের নিজ ভূখণ্ডে অস্থায়ীভাবে অবস্থানের অনুমতি দিল। বিশ্লেষকরা বলছেন, ইউক্রেন যুদ্ধ ও মার্কিন নীতির অনিশ্চয়তার মধ্যে রাশিয়া-ভারত সম্পর্কের এটি সবচেয়ে গভীর প্রতিরক্ষা সহযোগিতা।

দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় ভূরাজনৈতিক প্রভাব বিশ্লেষণ

১. দক্ষিণ এশিয়ায় শক্তির ভারসাম্য বদল

– চীন-পাকিস্তান অক্ষের পাল্টা জবাব: চীন-পাকিস্তান অর্থনৈতিক করিডোর ও গোয়াদর বন্দরে চীনের উপস্থিতির জবাবে ভারত-রাশিয়া অক্ষ তৈরি হলো। রুশ নৌবাহিনী ভারতের পূর্ব উপকূলের বিশাখাপত্তনম বা আন্দামান ঘাঁটি ব্যবহার করলে বঙ্গোপসাগরে চীনের প্রভাব কমবে।

– ভারতের ‘স্ট্র্যাটেজিক অটোনমি’ নীতি জোরদার: যুক্তরাষ্ট্রের QUAD ও রাশিয়ার সাথে RELOS – দুই নৌকায় পা দিয়ে ভারত নিজের দরকষাকষির ক্ষমতা বাড়াল। মস্কো-দিল্লি সম্পর্ক এখন শুধু অস্ত্র কেনাবেচায় সীমাবদ্ধ না, বরং ‘বুটস অন গ্রাউন্ড’ পর্যায়ে গেল।

– বাংলাদেশ-মিয়ানমার-শ্রীলঙ্কার উপর চাপ: ভারতের মাটিতে রুশ সেনা থাকা মানে দিল্লির আঞ্চলিক সামরিক বলয় আরও শক্তিশালী। রোহিঙ্গা ইস্যু বা তিস্তা নিয়ে বাংলাদেশের দরকষাকষির জায়গা কমতে পারে। আবার চীন যদি পাল্টা ব্যবস্থা নেয়, তাহলে বাংলাদেশকে ‘ব্যালেন্স’ করতে হবে।

২. ভারত মহাসাগর ও আর্কটিক সংযোগ

– আর্কটিক-ভারত মহাসাগর লিংক: RELOS-এর মাধ্যমে ভারতীয় নৌ ও বাণিজ্যিক জাহাজ রাশিয়ার আর্কটিক বন্দর ব্যবহার করে জ্বালানি, মেরামত ও বরফ ভাঙা জাহাজের সুবিধা পাবে। এতে ভারতের LNG আমদানি ও উত্তর মেরু রুটে প্রবেশ সহজ হবে।

– মালাক্কা প্রণালীর বিকল্প: দক্ষিণ চীন সাগরে উত্তেজনা বাড়লে ভারত-রাশিয়া আর্কটিক রুট ব্যবহার করে ইউরোপের সাথে বাণিজ্য করতে পারবে। এতে ASEAN দেশগুলোর ভূ-অর্থনৈতিক গুরুত্ব আংশিক কমবে।

৩. যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমা ব্লকের প্রতিক্রিয়া

– QUAD নিয়ে টানাপোড়েন: যুক্তরাষ্ট্র-অস্ট্রেলিয়া-জাপান চাইবে ভারত চীনবিরোধী শিবিরে থাকুক। কিন্তু রুশ সেনা ভারতে থাকলে ওয়াশিংটন প্রযুক্তি ও অস্ত্র দিতে গড়িমসি করতে পারে। ভারত ‘মাল্টি-অ্যালাইনমেন্ট’ চালাতে গিয়ে দুই কূল হারানোর ঝুঁকিতে পড়বে।

– নিষেধাজ্ঞার ঝুঁকি: G7 ইতিমধ্যে রাশিয়ার সাথে বাণিজ্যে নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে। ভারত-রাশিয়া লজিস্টিক সহযোগিতা বাড়লে CAATSA-এর আওতায় ভারতের উপর চাপ আসতে পারে।

৪. দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া ও ASEAN-এ প্রভাব

– ভিয়েতনাম-ইন্দোনেশিয়া-ফিলিপাইন দ্বিধায়: এই দেশগুলো চীনকে ঠেকাতে যুক্তরাষ্ট্র ও ভারত দুজনের সাথেই সম্পর্ক রাখে। ভারত যদি রাশিয়ার দিকে বেশি ঝুঁকে, ASEAN ভারতকে ‘নিরপেক্ষ অংশীদার’ হিসেবে আর বিশ্বাস নাও করতে পারে।

– মিয়ানমারে রুশ-ভারত যৌথ প্রভাব: রাশিয়া মিয়ানমার জান্তাকে অস্ত্র দেয়, ভারতও সীমান্তে কানেক্টিভিটি চায়। RELOS-এর পর দুই দেশ মিয়ানমারে যৌথ সামরিক মহড়া বা বন্দর ব্যবহার করতে পারে। এতে বাংলাদেশের নিরাপত্তা উদ্বেগ বাড়বে।

– অস্ত্র বাজার দখলের লড়াই: দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া রাশিয়ার অস্ত্রের বড় বাজার। ভারতের মাটিতে রুশ লজিস্টিক হাব হলে রাশিয়া দ্রুত সার্ভিসিং-স্পেয়ার পার্টস দিয়ে ASEAN-এ চীনা ও পশ্চিমা অস্ত্রকে টেক্কা দেবে।

৫. বাংলাদেশের জন্য করণীয় ও ঝুঁকি

– সুযোগ: ভারত-রাশিয়া ঘনিষ্ঠতায় বাংলাদেশ রাশিয়ার সাথে সরাসরি জ্বালানি ও পারমাণবিক সহযোগিতা বাড়াতে পারে। পায়রা বন্দর বা মাতারবাড়ী লজিস্টিক হাব হিসেবে ব্যবহারের প্রস্তাব আসতে পারে।

– ঝুঁকি: ১) ভারতের মাটিতে রুশ ঘাঁটি মানে ‘চিকেন নেক’ এলাকায় সামরিক তৎপরতা বাড়বে। বাংলাদেশ সীমান্তে BSF ইতিমধ্যে ১৬টি নতুন ব্যাটালিয়ন ও মিজোরামে ফরোয়ার্ড হেডকোয়ার্টার করছে।

২) চীন-মার্কিন দ্বন্দ্বে বাংলাদেশকে পক্ষ নিতে চাপ দেওয়া হবে।

৩) রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধে ভারতীয়দের সেনায় ভর্তি নিয়ে বিতর্ক চলছে। ভবিষ্যতে বাংলাদেশি শ্রমিকদের নিয়েও এমন ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।

সারকথা: RELOS চুক্তি দক্ষিণ এশিয়ায় ‘কোল্ড ওয়ার ২.০’-এর স্পষ্ট ছাপ। ভারত একদিকে QUAD, অন্যদিকে রাশিয়া – দুই মেরুতে খেলে নিজেকে অপরিহার্য করতে চাইছে। এতে স্বল্পমেয়াদে ভারতের দরকষাকষি বাড়লেও দীর্ঘমেয়াদে ‘স্ট্র্যাটেজিক ট্রাস্ট ডেফিসিট’ তৈরি হবে। বাংলাদেশের জন্য সময় এসেছে ‘মাল্টি-অ্যালাইনমেন্ট’ নীতি নিয়ে নতুন করে ভাবার। না হলে ১৭৫৭-এর মতো আবারও অন্যের যুদ্ধের ময়দান হয়ে যাব এই অঞ্চল।

What do you feel about this?

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Latest News