রাজনীতির মাঠে নতুন স্রোত: মুসলিম জাতীয়তাবাদের জোয়ারে কতটা প্রস্তুত বাংলাদেশ?

- মাঠের রাজনীতির হাওয়া বদলাচ্ছে, আর এই বদলের সবচেয়ে বড় প্রভাব দেখা যাচ্ছে তরুণ প্রজন্মের মধ্যে। দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা প্রচলিত রাজনৈতিক কাঠামো এবং অর্থনৈতিক বঞ্চনার ক্ষোভ থেকে এক নতুন আইডিওলজির দিকে ঝুঁকছে তারা, যার মূল সুর হলো মুসলিম জাতীয়তাবাদের পুনঃজাগরণ।
- চায়ের কাপ থেকে শুরু করে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম, সব জায়গায় এখন শেকড় এবং পরিচয়ের রাজনীতি নিয়ে ব্যাপক আলোচনা। এই আবেগের পালে হাওয়া দিয়েই রাজনীতিতে আত্মপ্রকাশ করেছে জাতীয় বিপ্লবী পরিষদের মতো নতুন দলগুলো। একেবারে তৃণমূল পর্যায় থেকে উঠে আসা এই জাতীয়তাবাদী ঢেউ প্রমাণ করছে যে, তরুণরা এখন আর পুরোনো রাজনৈতিক হিসাব নিকাশে সন্তুষ্ট নয়। তারা নিজেদের পরিচয়ের একটা শক্ত ভিত্তি চাইছে। নদীতে যখন হঠাৎ ঢল নামে, তখন যেমন তার প্রচণ্ড স্রোত সবকিছু ভাসিয়ে নিয়ে যায়, ঠিক তেমনি এই তারুণ্যের আবেগও এখন প্রবল শক্তিতে আছড়ে পড়ছে রাজনীতির মাঠে।
কিন্তু এই জায়গায় এসে পুরো বিষয়টিকে একটু প্রেসার টেস্ট করা দরকার। সংবাদমাধ্যম বা রাজনৈতিক বিশ্লেষক হিসেবে শুধু স্রোতের বর্ণনা দেওয়াই যথেষ্ট নয়, বরং স্রোতের গন্তব্য কোথায় সেটা নিয়ে প্রশ্ন তোলা জরুরি। তরুণদের এই যে আবেগ, তা নিঃসন্দেহে খাঁটি। কিন্তু রাষ্ট্র পরিচালনা বা দীর্ঘমেয়াদী ভূ রাজনৈতিক খেলায় শুধু আবেগ দিয়ে টিকে থাকা যায় না।
জাতীয় বিপ্লবী পরিষদের মতো দলগুলো যদি মনে করে কেবল জাতীয়তাবাদের স্লোগান দিয়েই তারা ক্ষমতার ভারসাম্য বদলে দেবে, তবে তারা বড় ধরনের কৌশলগত ভুলের মধ্যে আছে। আবেগের এই বেলুন বাস্তবে ফুটো হয়ে যেতে পারে যদি এর পেছনে কোনো নিরেট অর্থনৈতিক এবং কাঠামোগত ভিত্তি না থাকে। বিশ্ব এখন বহুমেরুর দিকে এগোচ্ছে, আর সেখানে টিকে থাকার লড়াইটা হয় অর্থনীতি, প্রযুক্তি আর সাপ্লাই চেইনের নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে। তাই এই জাতীয়তাবাদী ধারণার মধ্যে একটা বড় দুর্বলতা হলো, এখানে আবেগ যতটা আছে, বাস্তবসম্মত রাষ্ট্র পরিচালনার ব্লুপ্রিন্ট ততটা দৃশ্যমান নয়। এই দুর্বলতা কাটিয়ে ওঠার জন্য তিনটি বিকল্প কৌশলগত পথের দিকে নজর দেওয়া যেতে পারে।
প্রথমত, আইডিওলজিকে সরাসরি অর্থনীতির সাথে যুক্ত করতে হবে। তরুণরা জাতীয়তাবাদের ডাক শুনে রাস্তায় নামছে ঠিকই, কিন্তু দিন শেষে তাদের কর্মসংস্থান এবং গ্লোবাল মার্কেটের সাথে যুক্ত হওয়ার সুযোগ লাগবে।
এই নতুন রাজনৈতিক শক্তিগুলোকে স্পষ্ট করতে হবে কীভাবে তারা এই তরুণদের আধুনিক প্রযুক্তিতে দক্ষ করে তুলবে এবং একটি স্বাধীন অর্থনৈতিক কাঠামো উপহার দেবে। পেটের ক্ষুধা মেটানোর বাস্তব সমাধান না থাকলে কোনো আইডিওলজিই বেশিদিন টেকে না।
দ্বিতীয়ত, ভূ রাজনৈতিক বাস্তবতাকে মাথায় রেখে পররাষ্ট্রনীতি ঢেলে সাজাতে হবে। দক্ষিণ এশিয়ার এই অঞ্চলে বসে জাতীয়তাবাদের কথা বললে প্রতিবেশী দেশগুলো এবং বৈশ্বিক পরাশক্তিগুলো চুপ করে বসে থাকবে না।
তাদের দিক থেকে আসা কূটনৈতিক এবং কৌশলগত চাপ সামলানোর জন্য এই দলগুলোর নিজস্ব মেরিটাইম সিকিউরিটি ভাবনা বা রিজিওনাল ব্যালেন্সিং কৌশল কী, সেটা পরিষ্কার করা দরকার। শুধু দেশের ভেতরের মানুষদের তাতিয়ে না রেখে বাইরের বিশ্বের কাছে নিজেদের একটা যৌক্তিক শক্তি হিসেবে প্রমাণ করতে হবে।
তৃতীয়ত, সংগঠনের কাঠামোকে ডেটা নির্ভর এবং নিশ্ছিদ্র করতে হবে। রাজপথের আবেগ দিয়ে হয়তো একটা ধাক্কা দেওয়া যায়, কিন্তু দীর্ঘস্থায়ী পরিবর্তন আনতে হলে একটা সুশৃঙ্খল নেটওয়ার্ক লাগে। কোন কর্মীর দক্ষতা কী, কে কোথায় অবস্থান করছে এবং সংকটের সময় সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া কেমন হবে, তার একটা নিখুঁত প্রযুক্তিগত ব্যবস্থাপনা থাকতে হবে।
পরিশেষে বলা যায়, মুসলিম জাতীয়তাবাদের এই নতুন ঢেউ বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটা নতুন মাত্রা যোগ করেছে। জাতীয় বিপ্লবী পরিষদের মতো দলগুলো তরুণদের পালস ধরতে পেরেছে, এটা তাদের প্রাথমিক সাফল্য। কিন্তু এই সাফল্যকে দীর্ঘমেয়াদী করতে হলে আবেগের চশমা খুলে বাস্তবতার রুক্ষ মাটিতে দাঁড়াতে হবে। রাজনীতিতে শেষ হাসি তারাই হাসে, যারা আবেগের চেয়ে লজিককে বেশি গুরুত্ব দেয়।