খুদি থেকে শাহীন: বর্তমান অস্থির পৃথিবীতে প্রাসঙ্গিক আল্লামা ইকবালের দর্শন

আল্লামা ইকবালের দর্শন নিয়ে যখন কথা ওঠে, তখন আমাদের সাধারণ আলোচনাগুলো অনেক সময় শুধু কবিতা আর আবেগের মধ্যে আটকে থাকে। কিন্তু তার দর্শনের আসল জায়গাটা হলো ‘খুদি’ বা আত্মপরিচয়। ইকবাল মনে করতেন, মানুষ যতক্ষণ না নিজের ভেতরের অসীম শক্তিকে চিনতে পারছে, ততক্ষণ সে কেবল একটা জড়বস্তুর মতো। তিনি চেয়েছিলেন মানুষ যেন কেবল ভাগ্যের ওপর ভরসা করে বসে না থাকে, বরং নিজের ভাগ্য নিজেই তৈরি করে। তার দর্শনে কর্মহীন আধ্যাত্মিকতার কোনো স্থান নেই। তিনি বিশ্বাস করতেন যে ঈশ্বর বা মহাবিশ্বের সাথে মিলনের চেয়ে বড় সার্থকতা হলো নিজের অস্তিত্বকে এমন এক উচ্চতায় নিয়ে যাওয়া যেখানে স্রষ্টা নিজেই বান্দাকে তার ইচ্ছা জিজ্ঞেস করবেন।
এই দর্শনের রাজনৈতিক আর সামাজিক দিকটা আরও গভীর। বিংশ শতাব্দীর শুরুতে যখন মুসলিম বিশ্ব একটা চরম অস্থিরতা আর হীনম্মন্যতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছিল, তখন ইকবাল চেয়েছিলেন একটা আদর্শিক পুনর্জাগরণ। তিনি পশ্চিমের বস্তুবাদী দর্শনের সমালোচনা করেছিলেন ঠিকই, কিন্তু তাদের জ্ঞান-বিজ্ঞানের স্পৃহাটাকে গ্রহণ করতে বলেছিলেন। তার কাছে ধর্ম মানে ছিল একটা জীবন্ত শক্তি যা মানুষকে সচল রাখে, স্থবির করে দেয় না। ইকবালের ‘শাহীন’ বা ঈগল পাখির উপমাটা খেয়াল করলে দেখা যায়, তিনি কেন বারবার উঁচু আকাশ আর ঝড়ের কথা বলতেন। তার মতে, আরামদায়ক জীবন মানুষের আত্মাকে মেরে ফেলে, আর কঠোর সংগ্রাম তাকে অমরত্ব দেয়।
বর্তমান সময়ে ইকবালের দর্শনকে আমরা শুধু ইতিহাসের পাতায় সাজিয়ে রেখেছি। অথচ আজকের এই প্রতিযোগিতামূলক আর জটিল ভূ-রাজনৈতিক বাস্তবতায় তার ‘খুদি’র ধারণাটা সবচেয়ে বেশি প্রাসঙ্গিক। নিজের শেকড় না ভুলে কীভাবে আধুনিক বিশ্বের সাথে তাল মিলিয়ে নিজের স্বকীয়তা বজায় রাখা যায়, সেটাই ছিল তার চিন্তার মূল কেন্দ্রবিন্দু। আমরা যদি তার দর্শনকে কেবল পাঠ্যবইয়ের সংজ্ঞায় সীমাবদ্ধ না রেখে নিজের জীবনে প্রয়োগ করতে চাই, তবে প্রথম কাজ হবে নিজের সৃজনশীল ক্ষমতাকে অবমুক্ত করা। তিনি যে ‘নিশান-এ-রাহ’ বা পথের দিশার কথা বলে গেছেন, তা আসলে পরনির্ভরশীলতা কাটিয়ে নিজের পায়ে দাঁড়ানোর এক চিরন্তন আহ্বান।
ইকবালের চিন্তায় আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো সামষ্টিক চেতনা। তিনি মনে করতেন, একজন ব্যক্তি যখন তার নিজের ‘খুদি’ বা সত্তাকে চিনে ফেলে, তখন সে সমাজের প্রতি আরও বেশি দায়বদ্ধ হয়ে ওঠে। তার দর্শনে ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদ মানে স্বার্থপরতা নয়, বরং নিজেকে এমনভাবে গড়া যেন পুরো জাতি তার থেকে উপকৃত হতে পারে। আজকের দিনে যখন মানুষ কেবল যান্ত্রিক সাফল্যের পেছনে ছুটছে, তখন ইকবালের এই আধ্যাত্মিক আর বৈপ্লবিক মেলবন্ধন আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে মানুষের আসল শক্তি তার ভেতরকার অপরাজেয় ইচ্ছাশক্তির মাঝে লুকিয়ে আছে। এই শক্তিকে জাগিয়ে তুলতে না পারলে কোনো বড় পরিবর্তনই স্থায়ী হওয়া সম্ভব নয়।