ওয়াশিংটন তেহরান সমীকরণে আমাদের মেরিটাইম স্ট্র্যাটেজির উলটপালট

মাঝ দরিয়ায় যখন নিজেদের জাহাজ আটকা পড়ে তখন বুঝতে হয় যে শুধু কিনারায় বসে হিসাব কষলে চিড়া ভিজবে না। হরমুজ প্রণালীতে সম্প্রতি বাংলাদেশের জাহাজ আটকে দেওয়ার ঘটনাটা আকাশ থেকে পড়া কোনো বিষয় নয় বরং এটা ওয়াশিংটন আর তেহরানের সাপের নেউলের খেলার একটা সরাসরি ধাক্কা। আমরা দিনের পর দিন ভেবে এসেছি যে আমেরিকার সাথে ভালো সম্পর্ক রাখলেই বুঝি সাগরের সব রাস্তা আমাদের জন্য মাখনের মতো পরিষ্কার হয়ে যাবে।
কিন্তু এই চিন্তায় বড় ধরনের গলদ আছে। ইরান যখন আগে অনুমতি দেওয়ার পরও শেষ মুহূর্তে এমন একটা চাল চাললো তখন পরিষ্কার বোঝা যায় যে মধ্যপ্রাচ্যের এই উত্তাল পানিতে আমাদের পুরোনো সামুদ্রিক কূটনীতি আর ধোপে টিকছে না। আমরা যদি ভাবি শুধু পশ্চিমা শক্তির ছাতার নিচে দাঁড়িয়ে এই ঝড় পার করে দেব তবে সেটা হবে নিজেদের পায়ে কুড়াল মারার সবচেয়ে নিখুঁত উপায়।
এই জায়গাতেই আমাদের বর্তমান মেরিটাইম স্ট্র্যাটেজির একটু শক্ত প্রেসার টেস্টিং করা দরকার। আমরা এমন একটা সময়ে আছি যখন আমেরিকার মিত্ররাই খোদ পেন্টাগনের ভরসায় বসে না থেকে নিজেদের সামরিক আর অর্থনৈতিক শক্তি বাড়াচ্ছে। সেখানে আমরা যদি একতরফাভাবে ওয়াশিংটনের দিকে ঝুঁকে পড়ি আর তেহরানকে ইগনোর করি তবে সেটা হবে চরম বোকামি।
আবার উল্টোদিকে ইরানের ওপর ভরসা করে পুরো পশ্চিমা ব্লকের সাথে ঝামেলায় জড়ানোও কোনো কাজের কথা নয়। কারণ দিনশেষে আমাদের অর্থনীতি দাঁড়িয়ে আছে তৈরি পোশাক রপ্তানি আর রেমিট্যান্সের ওপর।
এই বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে যেকোনো এক দিকে পুরোপুরি হেলে পড়া মানে হলো ভূরাজনীতির জুয়ার বোর্ডে নিজেদের সব মূলধন একসাথে বাজি ধরা। এই ফাঁক গলার জন্য এবং নিজেদের মেরিটাইম স্ট্র্যাটেজিকে নতুন করে সাজানোর জন্য আমাদের সামনে অন্তত তিনটি বিকল্প পথ খোলা আছে।
প্রথম পথটি হলো সাগরের কূটনীতিতে ইস্যুভিত্তিক মাল্টি এলাইনমেন্ট বা বহুমুখী সম্পর্ক তৈরি করা। আমরা কারও চিরস্থায়ী বন্ধু বা শত্রু হব না। বাণিজ্যের জন্য আমরা আমেরিকার সাথে থাকব কিন্তু হরমুজ প্রণালীর নিরাপত্তার জন্য সরাসরি তেহরানের সাথেও একটা বিকল্প বোঝাপড়া চালু রাখব।
দরকার হলে ওমান বা কাতারের মতো দেশগুলোকে মাঝখানে রেখে ব্যাকচ্যানেল ডিপ্লোমেসি চালাব যাতে আমাদের জ্বালানি সরবরাহের লাইফলাইন কোনোভাবেই ওয়াশিংটন তেহরান উত্তেজনার বলি না হয়।
দ্বিতীয় বিকল্প পথটি হলো নিজেদের ঘরের কাছে অর্থাৎ বঙ্গোপসাগরে আঞ্চলিক শক্তিবলয় গড়ে তোলা। দূর প্রাচ্য বা পশ্চিমের দিকে তাকিয়ে না থেকে আমাদের উচিত জাপান বা আসিয়ান দেশগুলোর সাথে মেরিটাইম পার্টনারশিপ বাড়ানো।
মাতারবাড়ির মতো গভীর সমুদ্রবন্দরকে কেন্দ্র করে এমন একটা অর্থনৈতিক ও সামুদ্রিক জোন তৈরি করতে হবে যেখানে একাধিক আঞ্চলিক শক্তির স্বার্থ জড়িয়ে থাকে। এতে করে কোনো একক পরাশক্তি আমাদের ওপর সহজে ছড়ি ঘোরাতে পারবে না।
তৃতীয় কৌশলটি হলো জ্বালানি নিরাপত্তার জন্য শুধু একটা রুটের ওপর ভরসা ছেড়ে দেওয়া। হরমুজ প্রণালীর বাইরেও আফ্রিকা বা অন্যান্য বিকল্প বাজার থেকে জ্বালানি আনার লজিস্টিক রুট এখনই পাকা করে রাখতে হবে।
এর জন্য হয়তো সাময়িকভাবে একটু বেশি খরচ হবে কিন্তু আপৎকালীন সময়ে পুরো দেশ স্থবির হয়ে যাওয়ার চেয়ে সেই খরচ অনেক বেশি লজিক্যাল। অন্যের ঘাড়ে বন্দুক রেখে ফায়দা লোটার চেয়ে নিজেদের নেভাল ডিপ্লোমেসি আর অভ্যন্তরীণ সক্ষমতা বাড়ানোই এখন বিশ্বব্যবস্থায় টিকে থাকার আসল কৌশল।