ভৌগোলিক ও জনমিতিক শক্তি: বাংলাদেশের জনগণ কীভাবে এশিয়ার নতুন ভূরাজনৈতিক পিভট হিসেবে আবির্ভূত হচ্ছে?

ভূগোল আর জনমিতি নিয়ে আমরা আজকাল বেশ বড় গলায় কথা বলছি। বঙ্গোপসাগরের মাথার ওপর আমাদের অবস্থান আর বিশাল এক তরুণ জনগোষ্ঠী নাকি এশিয়া মহাদেশের নতুন ভূরাজনৈতিক পিভট বা ভরকেন্দ্র হয়ে উঠছে। এমন একটা কথা শুনলে যেকোনো বাঙালির বুক গর্বে ফুলে ওঠাটাই স্বাভাবিক।
গ্লোবাল ম্যাপে চোখ রাখলে মনে হবে সত্যিই তো একদিকে ভারত মহাসাগরের বাণিজ্য পথ অন্যদিকে চীন আর ভারতের মতো দুই জায়ান্টের মাঝখানে আমাদের অবস্থান। সাথে বোনাস হিসেবে আছে কাজ করতে পারা কোটি কোটি তরুণ হাত।
কিন্তু ভাই শুধু ম্যাপের ভালো জায়গা আর অনেক মানুষ থাকলেই কেউ গ্লোবাল পিভট হয়ে যায় না। তোমার এই চিন্তার কাঠামোতে একটা বড় ধরনের দুর্বলতা আছে আর এখানেই একটু শক্ত প্রেসার টেস্টিং করা দরকার।
বাস্তবতা হলো অদক্ষ মানুষের ভিড় কোনো ভূরাজনৈতিক সম্পদ নয় বরং সেটা একটা বিশাল বোঝা। আমাদের জনসংখ্যার একটা বড় অংশ যদি শুধু সস্তা শ্রমিকের কাজ করে বা বেকার বসে থাকে তাহলে আমেরিকা চীন বা ইউরোপ কেউই আমাদের গোনায় ধরবে না।
জনসংখ্যা তখনই গেম চেঞ্জার হয় যখন সেই জনমিতির সাথে প্রযুক্তি আর গ্লোবাল সাপ্লাই চেইনের শক্ত সংযোগ থাকে। শুধু ভৌগোলিক অবস্থান আর মানুষের মাথা গুনে এশিয়ার ভরকেন্দ্র হওয়ার এই দুর্বল ধারণা থেকে বেরিয়ে এসে আমাদের আসলে খুব লজিক্যাল এবং বাস্তবসম্মত কিছু পথে হাঁটতে হবে। জনসংখ্যাকে সত্যিকার অর্থে ভূরাজনৈতিক অস্ত্রে পরিণত করতে হলে আমাদের সামনে তিনটি বিকল্প স্ট্র্যাটেজিক পথ খোলা আছে।
প্রথম পথটি হলো সস্তা শ্রমের বদলে ডিজিটাল এবং টেকনোলজিক্যাল ওয়ার্কফোর্স তৈরি করা। আমাদের কোটি কোটি তরুণকে শুধু সাধারণ লেবার হিসেবে দেখার চিন্তা বাদ দিতে হবে। এর বদলে গ্লোবাল এআই প্রজেক্ট ডেটা অ্যানোটেশন পিক্সেল সেগমেন্টেশন বা ব্যাকএন্ড সার্ভার ম্যানেজমেন্টের মতো হাই ভ্যালু স্কিলে তাদের দক্ষ করতে হবে।
যখন গ্লোবাল টেক কোম্পানিগুলো তাদের কোর ডেটা বা এআই মডেল ট্রেইনিংয়ের জন্য আমাদের তরুণদের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়বে ঠিক তখনই এই জনমিতি আসল ভূরাজনৈতিক পাওয়ারে পরিণত হবে। তখন চাইলেও কোনো পরাশক্তি আমাদের সহজে পাশ কাটাতে পারবে না।
দ্বিতীয় বিকল্প পথটি হলো ডায়াসপোরা বা প্রবাসী জনগোষ্ঠীকে সরাসরি কূটনীতির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা। আমাদের লাখ লাখ মানুষ মধ্যপ্রাচ্য বা পশ্চিমা দেশগুলোতে কাজ করছে। আমরা শুধু তাদের পাঠানো ডলারের হিসাব কষি।
কিন্তু এই বিশাল জনগোষ্ঠীকে ওইসব দেশের অভ্যন্তরীণ অর্থনীতিতে প্রভাব ফেলার মতো একটা সুসংগঠিত শক্তি হিসেবে তৈরি করতে হবে। যখন আমাদের প্রবাসীরা হোস্ট দেশের অর্থনীতিতে এমনভাবে জড়িয়ে যাবে যে তাদের ছাড়া ওই দেশের চাকা ঘুরবে না তখন সেই দেশগুলো আন্তর্জাতিক ফোরামে বা হরমুজের মতো সংকটে আমাদের স্বার্থের পক্ষে কথা বলতে বাধ্য হবে। এটাই হবে মানুষের সংখ্যাকে কূটনীতিতে রূপান্তর করার আসল খেলা।
তৃতীয় কৌশলটি হলো মেরিটাইম এবং লজিস্টিক স্কিল হাব তৈরি করা। যেহেতু আমাদের ভৌগোলিক অবস্থান বঙ্গোপসাগরের তীরে তাই শুধু বিদেশি জাহাজের দিকে তাকিয়ে না থেকে নিজেদের মানুষকে গ্লোবাল শিপিং সাপ্লাই চেইন ম্যানেজমেন্ট এবং নেভাল টেকনোলজিতে দক্ষ করতে হবে।
আমাদের লোকবল যখন আঞ্চলিক বন্দরগুলোর অপারেশন আর লজিস্টিকস নিয়ন্ত্রণ করবে তখন ভৌগোলিক অবস্থান আর মানুষের স্কিল মিলে একটা ভয়ংকর শক্তিশালী কম্বিনেশন তৈরি হবে। আবেগ দিয়ে বিশ্ব রাজনীতি চলে না ভাই। মানুষের মাথা গুনে ভরকেন্দ্র হওয়ার স্বপ্ন বাদ দিয়ে এই মানুষগুলোকে যখন আমরা বৈশ্বিক অর্থনীতির অপরিহার্য অংশ বানাতে পারব কেবল তখনই বাংলাদেশ এশিয়ার সত্যিকারের ভূরাজনৈতিক পিভট হয়ে উঠবে।